আমার এক নাপিত বন্ধুকে নিয়ে কিছু কথা।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রিয় সাথী বৃন্দ, আগত শীতের সকালে আশা করি আপনারা সবাই ভাল আছেন। আমিও মহান আল্লাহ তায়ালার অপার মেহেরবানীতে অনেক ভাল আছি সুস্থ আছি।
শ্যামল, ওর নাম শ্যামল, সে আমার বন্ধু, একসাথে আমরা হাই স্কুলে পড়াশোনা করেছি। এরপর এসএসসি পাস করার পর ওরা অন্য কলেজে ভর্তি হয়েছিল আর আমি অন্য কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম কিন্তু হাই স্কুল টা একসাথে আমরা লেখাপড়া করেছি। বর্তমানে সে একজন দক্ষ নাপিত। যদিও সে নাপিত তারপরও একসাথে পড়াশোনা করেছি সেই সুবাদে এসে আমার বন্ধু আর বন্ধু হিসেবে তাকে আমি যথাযথ মর্যাদা এবং সম্মান করি।
বন্ধুকে নিয়ে কিছু স্মৃতিচারণঃ শ্যামল কতটা ভালো ছাত্র ছিল না। সে দুষ্টামিতে পারদর্শী ছিল। সে স্কুল জীবনে সবসময় পিছনের ব্রেঞ্চিতে বসতো। খেলাধুলা সে আগে যাইত। তখন সে আকারে বড় ছিল। আমরা ছোট ছিলাম। ক্লাসে স্যারেরা ওকে নিয়ে বেশ মজা করত। পড়াশোনা তেমন প্রার্থনা তারপরও ছাড় তেমন ওকে মারধর করত না। ও পড়াশোনা করতোই না দুরন্ত পোনায় মেতে থাকতো। সবসময় সে বিভিন্ন দুষ্টু কাজে ব্যস্ত থাকতো এমনকি ক্লাসের মেয়েদেরকে দেখে সে খুবই লজ্জা পাইতো। তাইতো মেয়েদের ধারে কাছে যেত না। পরীক্ষার সময় আসলে তারা পরীক্ষায় সময়মত আস্তানা আবার সময় শেষ হওয়ার আগেই পরীক্ষার খাতা জমা দিতো। কিন্তু যেদিন রেজাল্ট দিবে তার আগে এসে বসে থাকতো। কিন্তু তাদের নাম শীতে পাওয়া যায়তো না কারণ তারা একাধিক সাবজেক্টে ফেল করতো। যেমন মনে করেন ১১ টি সাবজেক্ট আছে প্রায় নয়টিতে ফেল করতো দুইটিতে পাস করতো। এরপর পরবর্তী ক্লাসে ওঠার জন্য স্যারদের কাছে ধরনা দিত। স্যাররা তাকে পরবর্তী ক্লাসের অনুমতি দিত এবং আবার ক্লাস করত।
স্বভাবঃ শীতল অত্যন্ত ঠান্ডা মেজাজের ছিল নম্র ভদ্র ছিল কিন্তু দুষ্টুমিতে ভরপুর ছিল। শীতল জাতিতে হিন্দু ধর্ম অবলম্বী । তাদের পাড়ায় অষ্টপ্রহর হয়তো বিভিন্ন পূজা হইত সে সমস্ত পূজায় আমরা ছোটবেলায় যাইতাম। ওরা সে পূজায় অনেক পারফর্ম করত। তবে শীতলের সবচাইতে ভালো ছিল। স্যারদের সাথে কখনো বেয়াদবি করত না কিন্তু দুষ্টামি করত। আমাদের সাথেও বন্ধুসুলভ আচরণ করতো কখনোই ঝগড়া ফ্যাসাদ করত না।
এসএসসি পাস করাঃ এসএসসি পরীক্ষা ঘুমিয়ে আসলে তারাও ফরম ফিলাপ করে। এবং পরীক্ষায় পাস করে পাস করার পরে ও কলেজে ভর্তি হয়েছিল কিনা তা আর জানিনা। এরপর সে এখন নাপিত হিসেবে কর্ম জীবন শুরু করেছে। তার বউ এবং একটি মেয়ে রয়েছে। মেয়েটি এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে।
তার কর্মস্থল কাজিপুরের সীমান্ত বাজারের পূর্ব পাশে রতনকান্দি রোডের সাথে রোডের ডান পাশে। একটি দোকান নিয়েছে সেখানে সে তার কর্ম করে খায়। আমি তার ঘরের বিভিন্ন ছবি তুলেছি এবং এগুলো আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম। আমি আমার মেয়েদের মাদ্রাসায় নিয়ে যাওয়ার পথেই তার দোকানটি সামনে পড়ে। প্রথম দিন যেদিন ওর সাথে আমার দেখা হয় সেদিন আমি ওকে প্রথমেই চিনে ফেলি। দেখার পরে অনেক ভালো লেগেছে এবং ওর যাবতীয় খোঁজখবর নিলাম ও আমার সম্পর্কে খোঁজ খবর নিল অনেকক্ষণ আলাপচারিত হলো। এরপর জিজ্ঞেস করলেন তুই কি করস সে বলে যে এই যে আমার দোকান আমি এখন নাপিত বা চুল কাটার কাজ করি।
জিজ্ঞাসা করলাম তোদের বাড়ি তো নদীর ভাঙ্গনে পতিত হয়েছে এখন বাড়ি কোথায় নিয়েছিস। সে জানালো সিরাজগঞ্জ সদরের বাগবাটি ইউনিয়নের সে এক জায়গায় তিন শতক জমি কিনেছে এবং সেখানেই বাড়ি করে আছে। শিব বাড়ি থেকে প্রতিদিন সীমান্ত বাজার তার দোকানে আসে আবার বিকেলে কাজ শেষে আবার বাড়িতে চলে যায়। সে একবার অ্যাক্সিডেন্ট করেছিল এক্সিডেন্টের ফলে তার পা একটা খোঁড়া হয়েছে। সে খুরে খুরে হাঁটে। তার স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারে কিন্তু আগের মতো না। তাকে জিজ্ঞেস করলাম তুই প্রতিদিন কত টাকা ইনকাম করস। বন্ধু আমার উত্তর দিল প্রতিদিন ৪০০ ৫০০-৬০০ ৭০০ এরকম ইনকাম হয়। এতেই তার সংসার চলে যায়।
তার দোকানের অবস্থাঃ তার দোকানের চিত্র থেকে দেখতে পাবেন যে আসলে তার দোকানটি আধুনিকতার ছোঁয়া নেই। সব পুরনো ভাঙ্গাচুরা অবস্থা। সে টাকার অভাবে সেগুলো কিনতে পারে না। তাইতো সে পুরাতন যন্ত্রপাতি দিয়েই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তার কোন যন্ত্রপাতি আধুনিক নয় সবই পুরাতন ভাঙ্গাচুরা। ঘরের উপরে সেলিং নেই। সামনের আয়নাটাও অনেক পুরাতন। এমনকি ব্যাক সাইট দেখার জন্য যে পিছনে একটা আয়না থাকে তাও অনেক পুরাতন ভাঙ্গা। কেচি গুলো অনেক পুরাতন এছাড়াও যে ফর্ম ইউজ করে ফর্ম গুলো ভালো মানের নয়। এছাড়া আধুনিক যে চুল কাটার মেশিন নেমেছে সেই মেশিন দিয়ে একটা দেখলাম তাও নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। এক কথায় বলা যায় তার দোকানের ভগ্ন অবস্থা কারণ হলো তার টাকার অভাব সে যে পরিমাণ ইনকাম করে তা দিয়ে তার সংসার চলতেই খুব কষ্ট হয় তারপরে আবার যন্ত্রপাতি কি কিভাবে কিনবে, কিনবে সে।
সে বন্ধু হিসেবে সবারই সমান। তাকে আমি ভিন্ন চোখে দেখি না আমার আরো যে বন্ধু-বান্ধব রয়েছে যারা আমরা একসাথে লেখাপড়া করেছি তারা অনেক চাকরি বাকরি করে কিন্তু এই বন্ধু যদিও চুল কাটা কাজ করে তবুও আমি তাদের সমানই মনে করি তার সাথে আমার কোন প্রকার অহংকার রাখি না। কারণ বন্ধু আমার নাপিত বা চুল কাটার কাজ করলে কি হবে বন্ধু তো বন্ধুই। তাই আমি যখনই যাই তার সাথে তার দোকানে বসি তার সাথে আলাপচারিতা করি এবং অতীতের স্মৃতিচারণ গুলো করে এতে অনেক ভালো লাগে। এবং পরিচিত লোকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় যে আমার পড়ার সাথী অর্থাৎ হাই স্কুলের বন্ধু।
তারপরে আমরা যখন বেশি আমরা যখন কথাবার্তা বলি তখন বোঝার উপায় নেই কি মুসলিম কে হিন্দু। ওরা হিন্দু ধর্মকে অনেক শ্রদ্ধা এবং ভক্তি করে এবং হিন্দু ধর্মের অনুশাসন অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলার চেষ্টা করে। বন্ধুও সবার সাথে দেখা হলেই কেউ আসলেই দেখা বলে যে এটি আমার বন্ধু হয়।
লেখাপড়া শেষে এখন অনেক বন্ধু বিভিন্ন জায়গায় কর্মরত রয়েছে যাদের সাথে দেখা হয় খুব কম তবে সবচেয়ে বেশি এখন দেখা হচ্ছে এই বন্ধুকে এই বন্ধু আমার চলার পথেই তার দোকানটি অর্থাৎ সকালে দেখা হয় বিকালে দেখা হয় দুপুরে দেখা হয় তার সাথে দেখা হয় কথা হয় এতে অনেক ভালো লাগে। সুযোগ পাইলেই তার সাথে বসি তার সাথে গল্প গুজব করে থাকি। তবে বন্ধু হিসেবে সে অনেক ভালো যদিও গরিব যদিও সে চুল কাটে যদিও সে নাপিত তারপরে বন্ধু হিসেবে সব গুনে তার মধ্যে রয়েছে।
আমি ওই বন্ধুদের সাথে বেশি বেশি কথা বলি যেগুলো আমার মত অর্থাৎ সেলফিশ ধরনের না। সে সমস্ত বন্ধুদের আমার খুব ভালো লাগে তাদের সাথে আমি মিশে থাকি। যারা বিপদে সাহায্য সহযোগিতা করতে পারে বা করে বিপদে খুশি হয় না বিপদের সমব্যথী হয় এরাই হলো প্রকৃত বন্ধু আর এই প্রকৃত বন্ধুর মধ্যে এই নাপিত বন্ধু আমার একজন প্রকৃত বন্ধু যদিও সে গরিব যদিও সে ছাটার কাজ করে তবুও সে বিভিন্ন দুঃখ বা বিভিন্ন ইমোশনাল বিষয় শেয়ার করলে সে সমব্যথী হয়।
আমরা জানি দুঃসময়ের বন্ধুই প্রকৃত বন্ধু। সুষমের বন্ধু প্রকৃত বন্ধু নয়। তাইতো বিপদের সময় প্রকৃত বন্ধুকে খুঁজে পাওয়া অনেক সহজ হয়। এছাড়া বন্ধু কি চেনার উপায় হল রাগের সময় প্রত্যেকটি মানুষকে সহজে চেনা যায়। সঙ্গ দোষেই সর্বনাশ হয় এ কথা চিরসত্য অবিস্মরণীয় বাণী। তাই আমাদের উচিত যে বন্ধু বিপদের সঙ্গী হয়, বিপদে সমব্যাথি হয়, বিপদে হাত বাড়িয়ে দেয়, বিপদে এগিয়ে আসে, সেই বন্ধুকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
আসুন আমরা যত ছোট বন্ধুই হোক না কেন যত নিম্নমানের বন্ধু হোক না কেন তাদেরকে আমরা বন্ধুর মতই মনে করি এবং তার সাথে বৈষম্য না করি কারণ অনেক এমন বন্ধু রয়েছে যে বড় হলেও তার ছোট বন্ধুদের পরিচয় দেয় না এমনকি কথাও বলে না এমনটি করা উচিত নয়। কারণ আমরা মানুষ, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোঃ সুলুল্লাহ আঃ সালাম শিক্ষা দিয়েছেন যে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ নাই এক মানুষ আরেক মানুষ থেকে কখনই শ্রেষ্ঠ হতে পারে না আর যে একজনের থেকে আরেকজন অথবা নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করবে সে অহংকারের দোষে পতিত হবে। আর কারো মধ্যে যদি অহংকার তিল পরিমাণ থাকে সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না তাই আসুন আমরা অহংকার মুক্ত জীবন যাপন করি এবং প্রত্যেক বন্ধুকে সমানভাবে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করি। কারো সাথে অহংকার না করি। তবে আশা করা যায়, আমরা মহান আল্লাহ তাআলার ক্ষমার যোগ্য হব। আমাদেরকে মহান আল্লাহতালা তার নিয়ামত পূর্ণ জায়গা জান্নাত দান করবেন। আমরা সবাই যেন, তার সেই নিয়ামত পূর্ণ জান্নাতে যাইতে পারি, আমিন সুম্মা আমীন।


