বাংলাদেশে শীতকাল:
পৌষ ও মাঘ এ দু মাস শীতকাল । এ ঋতু অনেকেরই প্রিয় ঋতু। এ ঋতুর তুলনা হয় না। শীতকালে আমাদের দেশে বৃষ্টিপাত হয় না বললেই চলে। ফলে পথঘাটে স্বচ্ছন্দে হাঁটা-চলার আনন্দ পাওয়া যায়। শীতকালে প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি পাওয়া যায়। এছাড়া শীতকালে এদেশের মানুষ পিঠাপুলি খেতে ভালােবাসে। শীতের সকালে খেজুর রসের কথা মনে হলে কার না ইচ্ছে করে শীতকালে ফিরে যেতে কবি সুফিয়া কামাল তাই শীতকে স্মরণ করেছেন এভাবে-
‘পৌষ পার্বণে পিঠা খেতে বসে খুশিতে বিষম খেয়ে
আরও উল্লাস বাড়িয়াছে মনে মায়ের বকুনি পেয়ে।
কুলের কাঁটার আঘাত সহিয়া, কাঁচা-পাকা কুল খেয়ে, অমৃতের স্বাদ যেন লভিয়াছি গাঁয়ের দুলালী মেয়ে।
শীতের সকাল:
শীতের সকাল যেকোনাে সকালের চেয়ে ব্যতিক্রম। গাছের পত্রপল্লবের কোনাে ফাক দিয়ে সকালের সােনা রােদ এসে স্পর্শ করে আমাদের বারান্দা আর উঠোন। শীতের সকালে ঈষদুষ্ণ রােদে বসে শীতের পিঠাপুলিতে সকালের নাশতা করতে সবারই ইচ্ছে হয়। গায়ে চাদর জড়িয়ে মেঠো পথে হাঁটতে গেলেই শিশির ভেজা ঘাস পায়ের গােড়ালি ভিজিয়ে দেয়। শিমুল ফুলের লাল পাপড়ির আড়ালে বসে দোয়েল, কোয়েল, ময়না, টিয়ে কিচিরমিচির শব্দ তুলে নেচে ওঠে কলতানে। সূর্যোদয়ের সময় পাখিরা গান গেয়ে গেয়ে শীতের সকালকে স্বাগত জানায়। সমস্ত আয়ােজনটা তখন হয়ে ওঠে প্রাকৃতিক। সামনে চোখ বাড়ালেই ফসলহীন শূন্য মাঠ, পাতাঝরা শূন্য গাছ দেখে তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন অভিমান করে ছুড়ে ফেলেছে তার পুরাতন সাজ । কবি কণ্ঠে ধ্বনিত হয়—
‘শীতের হাওয়ার লাগল নাচন আমলকির এই ডালে ডালে। পাতাগুলি শিরশিরিয়ে ঝরিয়ে দিল তালে তালে।
গাঁদা, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা আর সূর্যমুখীর গায়ে কাঁচা রােদের কোমল স্পর্শে যে ঝকঝকে সুন্দরের বিচ্ছুরণ ঘটে তা সত্যিই শীতের সকাল ছাড়া অন্য কোনাে সময়ে অবলােকন অসম্ভব ।
গ্রামীণ জীবনে শীতকাল:
গ্রামের অধিকাংশ মানুষ পেশাগত দিক থেকে কৃষির সাথে জড়িত। তাই শীতের সকালেও তাদের শীতের আরাম ও আনন্দকে উপভােগ করার সময় থাকে না শীতের কুয়াশা ভেদ করে লাঙল নিয়ে তারা হােটে ফসলের মাঠে। শীতকাল ইরি ধান রােপণের প্রধান সময়। এ সময়ে কৃষকের বসে থাকলে চলে না। অন্যদিকে, কৃষাণী বধূরাও সবজি ক্ষেতে শুরু করে পরিচর্যা, আবার কেউ তােলে শাকসবজি। শীতের কনকনে ঠান্ডা বার্ধক্য, পীড়িতদের খানিকটা বেশিই চেপে ধরে। তাই ভাের হলেই খড়কুটোর আগুন জ্বালিয়ে তারা উষ্ণ করে নেয় তাদের শরীর। এ সময় শিশুরাও এসে যােগ দেয়। আগুন পােহানাের কাজে। আর মাঝে মধ্যে চলতে থাকে রসপূর্ণ গল্পকথা। ওদিকে পিঠা বানানাের ধুম পড়ে যায় রান্নাঘরে।গরম গরম পিঠা আর মিঠে রােদ সব মিলিয়ে যেন অভূতপূর্ব আনন্দের আয়ােজন।
নগরজীবনে শীতকাল:
নগরজীবনে সাধারণত শীতকে উপভােগ করার সুযােগ কম। নগরের উঁচু তলার মানুষেরা গরম কম্বল জড়িয়ে ঘুমিয়ে কাটায় শীতের প্রভাত। ফলে তাদের পক্ষে সকালের কুয়াশাচ্ছন্ন সুন্দর রূপ অবলােকন সম্ভব হয় না। অন্যদিকে, চাকরিজীবী ও নিম্নবিত্ত মানুষ অফিসে আর কাজে বেরিয়ে পড়ে নগরের পথে পথে । কুয়াশা ভেদ করে ছুটে চলে তারা নিজ নিজ গন্তব্যে। জীবনের ব্যস্ততা চোখে পড়ে নিয়ত । গাড়িগুলাে দিনের বেলাতেও হেডলাইট জ্বালিয়ে ছুটে চলে অবিরাম। এখানে শিশিরে পা ভেজে না, পিঠার গন্ধে বাতাস ব্যতিক্রম হয়ে ওঠে না। দরিদ্র এ দেশে শীত বস্তিবাসীর জন্যে নিয়ে আসে দুর্ভোগ। নগরে ভাসমান মানুষ হয় শীতের নির্মম শিকার। বাস্তুহীন শিশু-বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ফুটপাতে, রেলস্টেশনে গরম কাপড় ছাড়াই প্রচণ্ড শীতের সাথে লড়াই করে।

