আম বৃত্তান্ত

N
              👉 👉👉আম্রপালি 👈👈👈
আজকে বলবো এক ক্ষ্যাপাটে কবির সাথে স্নিগ্ধ এক কবিতার সম্পর্ক। বলবো, এক বারাঙ্গনার সন্ন্যাসগ্রহণের উপকথা।যে কাহিনী মুখেমুখে ছড়িয়েছে ভারতের বিহার থেকে তিব্বত,চীন থেকে কোরিয়া উপদ্বীপ।জাপান থেকে সুদূর কম্বোডিয়া।আর থাকবে বিপ্লবসৃষ্টিকারী এক আমের গল্প।

মির্জা গালিবের প্রিয় বন্ধু হাকিম রজিউদ্দিন খাঁ। তিনি আম পছন্দ করতেন না। একদিন দুই বন্ধু দিল্লীর পথে হাটছিলেন। এসময় দুটি গাধা রাস্তা পার হচ্ছিল। গলিতে পড়েছিল আমের খোসা। গাধা দুটি তা না খেয়ে শুধু শুকে ছেড়ে দিল। হাকিম বন্ধুকে ঘায়েল করার সুযোগ পেয়ে বললেন “ দেখেছেন মির্জা সাহেব,আম কি রকম ফল যা গাধারাও খেতে চায় না।” মির্জার তাৎক্ষণিক তীর্যক উত্তর “ঠিকই বলেছেন হাকিম সাহেব, শুধু গাধারাই আম পছন্দ করে না।”

গালিবের পিতামহ সেনাবাহিনীতে চাকুরি করতেন।সে উপলক্ষে কিছু মাসোহারা পেতেন গালিব।বিভিন্ন নবাব তাঁকে মাসে মাসে কিছু টাকা দিতেন।একবার সেই মাসোহারা সংক্রান্ত কোন কাজে কলকাতা এসে আটকে গেলেন গালিব।বেশ কয়েকমাস ছিলেন।এখানেও মাশায়েরদের সাথে ঝগড়া বিবাদ করতেন।ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া দেখাতেন।আর মদ খেয়ে সব টাকা উড়িয়ে দিতেন।তিনি কলকাতাকে ভালবেসেছিলেন বাংলার আমের জন্য।আমের প্রেমে মজেছিলেন।

গালিব থেকে আজকে সোজা জীবনানন্দে চলে যাবো। গালিব ফিলসফার ছিলেন না।সোজাবাংলায় কোন থট প্রতিষ্ঠার চিন্তাই করেন নি।তাঁর কবিতাই একেকটা ফিলসফি।জীবনানন্দও খানিকটা তাই।আজ কাব্য তুলনা বা ব্যাখ্যার জন্য আসিনি।এসেছি আম কেন্দ্রিক লেখা লেখতে।জীবনানন্দ লেখলেন,

 "হাজার বছর ধ’রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ’পর
হাল ভেঙে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।"

এতশত ভণিতা  "শ্রাবস্তীর কারুকার্য " এর শ্রাবস্তীর জন্য।শ্রাবস্তী নামে প্রাচীন ভারতে এক নগর ছিল।সেখানের এক আমবাগানে একটা শিশু কুড়িয়ে পান মহানামা নামে এক ভদ্রলোক।সেই কন্যাসন্তানের নাম রাখা হলো "আম্রপালি "। আম্রপালি মানে আমের পল্লব বা পাতা। আম্রপালি ছিলেন  বৈশালী নগররাষ্ট্রের সবচেয়ে সুন্দরী।সেজন্য নগরপিতা ঠিক করেন,আম্রপালি কারো বধূ হবেন না,হবেন নগরবধূ।তখন বৈশালী রাষ্ট্রের সাথে চূড়ান্ত শত্রুতা ছিল মগধের।মগধরাজ বিম্বিসার আম্রপালির রূপের নাম শুনে লুকিয়ে দেখা করতে আসেন শত্রুরাজ্যের নগরবধূ আম্রপালির সাথে।তাদের প্রেমের উপাখ্যান নানা পালি এবং সংস্কৃত স্ক্রিপ্টে পাওয়া যায়।

তো,সেই অনিন্দ্যসুন্দরী রূপসী একদিন দেখলেন, এক গেরুয়াবসনের গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী ভিক্ষা করছে।আম্রপালির দিকে তিনি তাকালেন মায়ার দৃষ্টিতে।সে চোখে কাম ছিল না,ছিল মায়া।আম্রপালি সে সন্ন্যাসীকে গৃহে থাকার আমন্ত্রণ জানালেন।বড় বড় রাজা সামন্তরা আম্রপালির সাথে থাকার সুযোগ খুঁজতেন।সে গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী আম্রপালির নিমন্ত্রণ উপেক্ষা করলেন।আম্রপালি বিস্মিত হলেন।

সে গৃহত্যাগী সন্ন্যাসীর নাম ছিল বুদ্ধ।গৌতম বুদ্ধ।এক আম বাগানে আম্রপালিকে সন্ন্যাসে দীক্ষিত করেন মহামতি বুদ্ধ।আম্রপালি নগরবধূ থেকে ইশ্বরের প্রচারক হয়ে যান । 

জানার জন্য বলি,বিম্বিসার বৌদ্ধধর্ম প্রচারে ভূমিকা রেখেছিলেন।রাজা বা সম্ভ্রান্ত মানুষ যে সন্ন্যাসীদের কাপড় মানে চিবর দান করেন;তার প্রচলন করেছিলেন জীবনানন্দের বিম্বিসার।আম্রপালির এই কাহিনী তিব্বতি লেখায় এক রকম,পালিতে এক রকম।আবার চৈনিক টেক্সটে এই উপকথা আরেক রকম।তবে যিশুর জন্মেরও কয়েকশো বছর আগে আম্রপালি নামে একজন সত্যই ছিলেন।বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে বৈশালি,বিম্বিসারের মগধের প্রমাণ পাওয়া যায়।

সোজা চলে আসি প্রাচীন ভারত থেকে আধুনিক ভারতে। বুঝতেই পারছেন,আজ বলবো আম্রপালি আমের কথা।ভারতের কৃষিবিদগণ বিশেষ করে তাদের প্রতিষ্ঠান IARC,যা দিল্লীতে অবস্থিত;বহুদিন ধরেই চেষ্টা করছিল একটা হাইব্রিড জাতের আম তৈরীতে।এই ধরনের আম কৃষিজমিতে অল্প দূরত্বে চাষ করা যাবে । উচ্চফলনশীল। কম সময়েই ফল আসবে।

১৯৭১ সালে ড.পীযুষ কান্তি মজুমদার নীলম আর দুসেরী নামে ভারতীয় দুইটা জনপ্রিয় আমের কৃত্রিম পরাগায়নে তৈরী করেন একটা আমের জাত।১৯৭৮সালে ভারতের কৃষি সংস্থা এই প্রজাতির আমগাছ "আম্রপালি " নামে অবমুক্ত করে।

তুমুল জনপ্রিয় একটা প্রজাতি।এই আম বাংলাদেশের কৃষিতে একটা চেঞ্জ নিয়ে আসছে।বিশেষত,সাতক্ষীরা,ঝিনাইদহ এবং নওগাঁ তে বানিজ্যিক আম চাষের শুরু এই আম দিয়ে।অন্যান্য আমের চেয়ে দেরীতে বাজারে আসে বলে,এর বাজারদরও থাকে বেশী।

গত দশকে ধানের নায্যমূল্য না থাকায়,হেক্টরের পর হেক্টর কৃষিজমিতে আম্রপালি চাষ করা হচ্ছে।আগে একপুরুষে গাছ তৈরী করলে,আরেক পুরুষ সে ফল পেতো।আম্রপালির কারণে মাত্র দুবছরেই আম চলে এসেছে গাছে।সামগ্রিক আমবাজারেই আম্রপালি পরিবর্তন নিয়ে এসেছে।

আম্রপালির চাষ এতই বেশি হচ্ছে,সামনের দিনগুলোতে এই উচ্চফলনশীল আমের বাজারদর কতটা থাকে;সেটা বিশ্লেষণের দাবী রাখে।

এই আমের দুইটা জাত।একটার আকৃতি ছোট।গড় ওজন ১৭০গ্রাম।আরেকটার গড় ওজন ২৪০গ্রাম।এই আম জুন জুলাই মাসে বাজারে আসে।এর মিষ্টতা ২৪ শতাংশ। খাদ্য উপযোগী অংশ ৭৫ ভাগ।

এই আম খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছে।প্রচন্ড মিষ্টি।আঁশবিহীন।


Comments